ধর্মীয় স্বাধীনতা - পরিবর্তিত পট

 (দেবজ্যোতি মিত্র)

আমি নিজেকে ধর্মীয় স্বাধীনতা বিরোধী বলে মনে করি না। তবুও আমার বিবেক আমায় এই লেখাটি লেখার জন্য উৎসাহিত করছে । ছোটবেলায় চারিদিকে মুসলমানদের অস্পৃশ্য দোষে দুষ্ট হতে দেখেছি, সেটাই যে আমাদের দেশে ইসলাম ধর্মের বাড়বাড়ন্তের কারণ , সেটা বড় হয়ে বুঝেছি। আমার কিন্তু কোনোদিনই সামসুদ্দীনের সঙ্গে একটা পাঁচ পয়সার জলবালা আইসক্রিম ভাগ করে খেতে অসুবিধা হয় নি, যদিও মায়ের নিষেধাজ্ঞা ছিলো এঁটো না খাওয়ার জন্য, কিন্তু কে কার কথা শোনে, ওর বাবার অনেকগুলো বাস আছে, তাই পয়সা ওর পকেটে রোজ থাকে, আমার চাকরিজীবী বাবা মা ছেলের হাতে পয়সা দিয়ে বখাতে রাজি ছিল না।

একটু বড় হলাম, আমার সময় তৃতীয় ভাষার পরীক্ষা দিতে হতো মাধ‍্যমিকে, আমার স্কুলে দুটি অপশন, সংস্কৃত এবং আরবি। খান আট দশ মুসলিম ছেলের মধ্যে দুজন কি তিনজন আরবিতে গেলো, বাকি সব্বাই সংস্কৃত, বিশেষ করে যেসব বাড়িতে শিক্ষার পরিবেশ ছিল তারা নির্দ্বিধায় সংস্কৃত নিলো, কারণ তখন ভাষাটি হিন্দুদের ভাষা হয়নি, আর আরবি তো বিজাতীয় ভাষা।

ছোটবেলায় মা বাবার সাথে লখনৌ বেড়াতে গিয়েছিলাম, সকালে নেমে চমকে উঠলাম, মেয়েগুলোর এরকম আপাদমস্তক ঢাকা কেন রে বাবা, মা কে জিজ্ঞেস করলাম ওরা নিঃশ্বাস নিচ্ছে কি করে? আমি তো তার আগে বোরখা পরা কাউকে দেখিই নি।আজ যখন দেখি কাঠফাটা রোদ্দুরে মশাগড় গ্ৰামের আমিনা বোরখা পরে যাচ্ছে, সেই ছোটবেলার মতোই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি, এ ক বছরেই আমার বাংলার এত পরিবর্তন, আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে মাদ্রাসা শিক্ষিত কোনো বন্ধুর কথা মনে পড়ে না, এখন দু একজন ছোটবেলার বন্ধুকে দেখি আল্লার বান্দা হবার জন্য, বিশেষ ভাবে কাটা দাড়ি রেখেছে, মাথায় চব্বিশ ঘণ্টা টুপি পরে , গোড়ালির উপরের ঝুলের পায়জামা পরে, আশ্চর্য হয়ে দেখি, এটাই তো সিরাজ, এটাই মাসুদ।

জানিনা কি মন্ত্রবলে আমার ছোটবেলার দেখা চারপাশটা রোজ বদলে যাচ্ছে, কেন ভোরবেলায় ঘুম ভেঙ্গে মাইকে শুনতে হয় বিভিন্ন সুরে বিভিন্ন জায়গা থেকে ভেসে আসা আজানের ডাক, আমার ছোটবেলায় তো এসব ছিল না, পাঁচ বার নামাজ পড়া মানুষ তো ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, ঈদে মহরমে জলসায় চাঁদা তোলার লোক দেখছি মাত্র কয়েক বছর, জানিনা ইসলাম এ এর কোনো ব‍্যাখ‍্যা আছে কি না, আমার একান্ত ব্যক্তিগত খারাপ লাগা থেকেই এই লেখা, মাঝে মাঝে মনে হয় ধর্মস্থাপনের অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছে চারিদিকে।বন্ধ হোক এসব, ফিরে আসুক আমার ছোটবেলার পৃথিবী, আবার একটা আইস্ক্রিম ভাগ করে খাই আমি আর মাসুদ।

মন্তব্যসমূহ