বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন পরিবর্তনের জন্য

(সুমিত রায়)

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন - ২০১৬ তে বলা হয় 'অপ্রাপ্তবয়স্ক বা ১৮ বছরের নিচে কোন মেয়ের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় বিয়ে দেয়া হলে সেটিকে বাল্যবিবাহ বা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে না।'। এখানে 'বিশেষ বিবেচনায়' কে আবার সংজ্ঞায়িত করা হয় নি। তো দেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বিশেষজ্ঞজনের কথা থেকে যা বোঝা যায় তা হল, এই আইন অনুসারে, ১৮ বছরের নিচে কোন নারীকে ধর্ষণ করা হলে গ্রামের সালিশ ব্যবস্থায় ধর্ষকের সাথেই ধর্ষিতার বিবাহের ব্যবস্থা করা হতে পারে (গ্রামে এরকম টেন্ডেন্সি আগেও দেখেছি, আগে আইন ছিল না বলে কম হত, এখন আর বাঁধা নেই)। এছাড়া এই 'বিশেষ বিবেচনায়' এর ফাঁক দিয়ে বাল্যবিবাহ আরও বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেরকম সামাজিক ব্যবস্থার দোহাই দিয়েছেন, কন্যার বাবা মাও কন্যার বিবাহকে জাস্টিফাই করতে এই সামাজিক ব্যবস্থারই দোহাই দেবেন। 

তো যাই হোক, যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে। এখন আমরা যারা এই বিষয়ে সচেতন, তাদের উচিৎ পরিস্থিতির পরিবর্তন কিভাবে করা যায় তা নিয়ে চিন্তা করা। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন - ২০১৬ পরিবর্তন করতে
(১) এই আইনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এরকম কিছু কোর্ট কেস বা আদালতি মামলা দরকার
(২) লেজিসলেশন চেঞ্জ করতে সরকারী আমলা কর্তৃক লবিং দরকার
(৩) পরিবর্তনের একটা এম্পিরিকাল বেসিস তৈরির জন্য অনেক গবেষণা ও লেখালেখি দরকার

এগুলো ব্যক্তিগতভাবে হয় না, কোন এনজিও লাইসেন্স প্রাপ্ত এবং মিনিস্ট্রি অব উইমেন এন্ড চিল্ড্রেন এফেয়ার কর্তৃক নিবন্ধকৃত সংগঠন করতে পারে। কারণ তারা এডভোকেসি ও রিসার্চ কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং কার্যের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে ও সরকার থেকে ফান্ডিং পায়।
আমাদের দেশে বৃহৎ পরিসরে নারী (ও শিশু) সংগঠনগুলোর মধ্যে আছে বাংলাদেশ উইমেন ফাউন্ডেশন। এই সংগঠনটি গ্লোবাল ফান্ড ফর উইমেন, DANIDA, USAID থেকে প্রচুর ফান্ডিং পায়। এছাড়া রিসার্চ গ্রুপগুলোর মধ্যে আছে Women for Women (রিসার্চ ও এডভোকেসি), Steps Towards Development (রিসার্চ, সোশ্যাল ওয়ার্ক), ব্রাক, সেইভ দ্য চিল্ড্রেন ইত্যাদি। তাদের সাথে যোগাযোগ করে দেখা যায় তারা এধরণের উদ্যোগ নিতে পারে কিনা।

কিন্তু দেশে যেহেতু এই আইন প্রণয়ন হয়ে গেছে, সেখানে নারী শিশু উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর উপর অন্য পক্ষ থেকে লবিং থাকতে পারে। আমরা দেখেছি ব্রাকের গবেষণা দেখানো ও বিভিন্ন মহলের প্রতিবাদের পরও নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বিশেষ শর্তের কথাই বললেন। এধরণের আচরণের জন্য যে সাপোর্ট দরকার তারা তা পেয়েছেন বলেই এভাবে বলতে পেরেছেন। প্রশ্ন ওঠে এটা লীগের ইচ্ছার সাথে বিভিন্ন লবিং ও নারী বিষয়ক সংগঠনগুলোরও সমর্থনপুষ্ট কিনা। হাসিনা আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর দাবীকে ডিফেন্স করতে এত জোড় দিয়ে দেশের 'বিশেষ সামাজিক অবস্থার' কথা বলেন কিভাবে? সন্দেহ আরও প্রকট হয় যখন দেখি এই আইনের প্রতিবাদ কেবল NCTF (ন্যাশনাল চিলড্রেন টাস্ক ফোর্স), সেইভ দ্য চিলড্রেন এর মত শিশু সংগঠনই করছে। কোন নারী সংগঠনকে তেমন কিছুই করতে দেখা যায় নি। দেখা গেলে জানাবেন।

তারা আদৌ কমপ্রোমাইজড কিনা, কিংবা এসম্পর্কে কাজ করতে তারা আগ্রহী কিনা এটা জানবার জন্য তাদের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। আওয়াজ দিতে দিতে কানের পর্দা ফাটিয়ে দিতে হবে। তাও যদি দেখা যায় কিছু হচ্ছে না, তাহলে আমি বলব, দেশে স্কেপটিক ধারার নারীবাদী সংগঠন তৈরির সময় এসে গেছে।

মন্তব্যসমূহ