(সুদেষ্ণা চক্রবর্তী)
তখন সাত্যকির সাথে আমার প্রেমপর্বের একেবারে গোড়ার দিক। এরমধ্যে একদিন দুজনে সিনেমা দেখে এলাম, মিঃ নটবরলাল, হুগলীর মিলন সিনেমাহলে। জানিনা সে হল এখনো টিকে আছে কিনা। সে কতদিন আগের কথা , আজকের ?
সেদিন , দুজনের চন্দননগর আপ প্ল্যাটফর্মে দেখা করার কথা, সাত্যকিই ট্রেনের টিকিট কেটে আনবে। আমার বাড়ি স্টেশন থেকে মিনিট পাঁচেকের পথ। বাবা মা এক আত্মীয়ের ওখানে উত্তরপাড়ায় গেছেন। আমি ফাঁকা বাড়িতে থেকে থেকে বোর হচ্ছিলাম বলে, না জীবনের প্রথম অভিসার যাকে আমাদের ছেলেপুলেরা ডেট বলে, তাইতে যাচ্ছি বলে মনের ভিতর চরম উত্তেজনার জন্যই হয়তো সময়ের একটু আগে এসেই উপস্থিত হয়েছিলাম। আমার কেন জানি মনে হয়েছিল, সাত্যকিও আমার মতোই উতলা হয়ে হয়তো আমার আগেই এসে দাঁড়িয়ে থাকবে। ওমা কোথায় কি! কুঞ্জবন মানে প্ল্যাটফর্ম তো সাত্যকি শূণ্য। হায় গো, তখন কি আর জানতাম, আমার প্রেমিকপ্রবর একটি লেটলতিফ । এই শুরু হল আমার প্রতীক্ষার অধ্যায় , এরপরে বিয়ের আগে , বিয়ের দিন এবং বিবাহের পরবর্তী কালে এ শবরীর প্রতীক্ষা আমার বলবৎ ই থাকবে।
নির্দিষ্ট সময় পেড়িয়ে যাওয়ার আধঘণ্টা পর , যখন আশেপাশের প্রচুর চেনা অচেনা মানুষের মাঝে স্থানকাল বোধ হীন আমি ক্রমাগত চোখের জল মুছছি, আর বাড়ি ফিরে যাব কিনা ভাবছি, তখন দেখি পাবলিক আসছেন, হন্তদন্ত হয়ে, কপালে প্রবল ভ্রুকুটি । যেন আমি ই দেরী করে ফেলেছি, কিম্বা যেন গোটা পৃথিবী এক দারুণ ষড়যন্ত্র করে ওর বিলম্ব ঘটিয়েছে। অভিমান প্রকাশ করার আগেই পরের ট্রেন এসে গেল। এ ট্রেন মিস করলে আর সিনেমা দেখা হয় না। সুতরাং চোখের জল মুছে ট্রেনে উঠে পরলাম। তাকিয়ে দেখি , রাগ করব কি, বাবু নিজেই ভীষণ রকম চটে আছেন, আমার উপর, না নিজের উপর, না তাবৎ বিশ্বসংসারের উপর , সঠিক বোধগম্য হল না।
সিনেমার টিকিট সাত্যকিই কাটল ড্রেস সার্কেলে । বুঝলাম খরচের ব্যাপারে ছোকরা বিন্দাস। সে অবিশ্যি, এতো বছরে ভালোই টের পেয়েছি। আমরা সপরিবারে ভ্রমণের সুযোগ হয়তো কম ই পেয়েছি , কিন্তু যেটুকু ঘুরেছি, আরাম ও স্বাচ্ছন্দের কোনো ত্রুটি রাখেনি সাত্যকি।
দুটিতে মিলে সিনেমা দেখতে তো বসলাম, কিন্তু আমি সিনেমা দেখব কি, কাঁটা হয়ে বসে আছি । ও যদি অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অসভ্যতা করে, তদ্দন্ডেই একটি চড় কষিয়ে বেরিয়ে আসব । না: ছেলে ভালো। আমার একখানি হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে দিব্যি সিনেমার গল্পের মধ্যে ডুবে গেল । আর আমি ? ওর গা থেকে ভেসে আসা কি এক অচেনা পুরুষালি সৌরভে আবিষ্ট আমি , ওর হাতের মধ্যে যেন নিজের হৃদয়ের সমস্তটুকু উজাড় করে দিয়ে , আচ্ছন্নের মতো বসে রইলাম। রেখা অমিতাভের নাচা গানা, গল্পের বিষয়বস্তু কিছুই মগজে ঢুকল না।
সেদিন ওখান থেকে ফিরে চুঁচড়োর ঘড়িরমোড়ের টাওয়ার ভিউতে মোগলাই খেয়েছিলাম। এবারে দাম দেবার পালা আমার । এটা আমারই সিদ্ধান্ত । যদিও সাত্যকি তখন ব্যাঙ্কে চাকরী করছে , আর আমার আর্থিক আমদানি বলতে , আমার পা খরচ অর্থাৎ রিক্সাভাড়া , বাড়ি থেকে কলেজ যাতায়াত আমি হন্টনে ম্যানেজ করে যা জমিয়ে রাখতাম , সেটুকু যত সামান্য ই হোক, আমার স্বাভিমান বজায় রাখার পক্ষে যথেষ্ট ছিল ।
দু এক সপ্তাহ পরে, সাত্যকি বলল, " চলো রোববার সিমলাগড় যাই। যাবে? "
এ আবার বলতে হয়? সিমলাগড় নামটা খুব চেনা চেনা লাগলেও , জায়গাটার বিশেষত্ব কিছুতেই মনে পড়ল না । আমি সিমলা কখনো যাই নি। সেখানকার দর্শনীয় স্থান কি কি আছে জানা নেই। ভাবলাম, সিমলার মতো কিছু জবরদস্ত দর্শনীয় কিছু আছে হয়তো , কিম্বা গড় বা কেল্লা, বা ঐতিহাসিক কিছু স্থান, আমি আবার একটু ইতিহাসপ্রেমী কিনা। সাত্যকিকে জিজ্ঞেস করতে ঠিক সাহস হল না। জায়গা টি ট্রেনে বর্ধমান যাওয়ার পথেই পড়ে, এটুকু জানা আছে। সে তো কত স্টেশন ই আছে । সব কটি জায়গার বিশেষত্ব কি আর জানি ? কিন্তু আমার অতি পণ্ডিত , ভূগোলে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্থান অধিকারী স্নাতক প্রেমিক টি জানেন। তিনি আবার তখন আমার জিওগ্রাফি অনার্সের গৃহ শিক্ষক। বুরবকের মতো প্রশ্ন করে বকুনি খাই আর কি। সুতরাং " আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা , আমি যে পথ চিনিনে " টাইপ প্রেমে গদগদ আমি রাজি হয়ে গেলাম।
পরের রোববার আবার যথারীতি আমায় বেশ কিছুক্ষণ স্টেশনে দাঁড় করিয়ে তিনি এলেন, না এবারে আর বিরক্ত মুখে নয়, বরং দুগালে টোল ফেলে আমার হৃদয়জয়ী হাসি হেসে এলেন। ফাঁকা ট্রেনে গল্প করতে করতে কখন পৌঁছে গেলাম শিমলাগড়। স্টেশনে নেমে দেখি চতুর্দিকে বালি আর বালি । বালির পাহাড় একেবারে । মুখ দিয়ে আপনি প্রশ্ন বেরিয়ে এলো ,
" এতো বালি কেন? "
সাত্যকি একটু ও বিরক্ত না হয়ে বলল,
" জানো না ? এখানেই তো বালির খাদান। "
" অ"
জানতাম না জানা হল । এবার? সাত্যকি বলল,
" চল, দেখতে পাবে। "
স্টেশনের সামনে প্রচুর রিক্সা । ভাবলাম, একটায় উঠব বোধহয়। না:। সাত্যকি হাতের ইশারায় তাদের না করে দিলে। ঠিক হ্যায় । চল হাঁটি। যদিও হাঁটতে আমার কষ্টই হত, শুধু পয়সা বাঁচানোর তাগিদে ই হাঁটতাম। তবু সে অভ্যেস তো তখন ছিল। সুতরাং চওড়া বড় রাস্তায় , লম্বা লম্বা গাছের ছায়ায় শেষ অপরাহ্নের আলো গায়ে মেখে প্রেমিক যুগল পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। আহা কি রোমান্টিক দৃশ্য । আসলে দৃশ্য টা কিন্তু মোটেই তেমন রুমানী ছিল না । সাত্যকি আর আমার উচ্চতার ফারাক বেশী নয় , মাত্র এক ফুট । ওর এক কদম, মানে আমার চার কদম । তার উপর পায়ে আমার হাই হিল । ফলে ঐ উটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে আর তত ভালোবাসার মধু টের পাচ্ছিলাম না। এদিকে , হাঁটছি তো হাঁটছি । পাশে তিনি সমানে বালির ইতিহাস আউড়ে যাচ্ছেন । মনে মনে আতঙ্কিত হচ্ছি , একি রে বাবা , এ লোক কি সারাজীবন আমায় শুধু ভূগোল ই পড়িয়ে যাবে , দুটো প্রেমের কথা কইবে না। এই পথ যদি না শেষ হয় , ব্যাপার টা আর সহ্য করতে না পেরে , একটু খেঁকিয়েই জিজ্ঞাসা করলাম,
" আর কদ্দুর হাঁটতে হবে?
সাত্যকি বেশ উৎসাহ নিয়েই বলল,
" এই তো এসে গেছি । "
কোথায় এসে গেছি ? আশেপাশে কোনো বনবিতান, কোনো নদীর ধার , বা কোনো ঐতিহাসিক ইমারতের ধ্বংসবিশেষ কিছুই তো নজরে আসছে না। রাস্তার ডান দিকে এক কালী মন্দির। সাত্যকি সেখানে জোড় হাত করে দাঁড়িয়ে পড়ল । জানি ও খুব কালী ভক্ত । আমি আবার কৃষ্ণপূজারিণী । খর্গ হাতে লকলকে লোলজিহ্বা করালবদনী এই দেবী কে আমি কি এক অজ্ঞাত কারণে দারুণ ভয় পেতাম। এর আগে স্বইচ্ছায় কোনোদিন কোনো কালী মন্দিরে ভুলেও প্রবেশ করিনি । যদিও সেই আমি ই এখন আদ্যাশক্তির উপাসিকা । আমার জীবন এমনই। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে জীবন আমায় নিয়ে বিচিত্র খেলা খেলেছে।
সাত্যকিকে তদগতচিত্তে প্রণাম করতে দেখে , আমি ও ভয়ে ভয়ে হাতজোড় করে প্রণত হলাম। শুনলাম, দেবী খুব জাগ্রত । লোকে নতুন গাড়ি কিনে এখানে পুজো দিয়ে যায় । খুব ভালো। ভবিষ্যতে আমাদের চারচাকা কেনা হলে না হয় এখানে পুজো দেওয়া যাবেখন। কিন্তু এবার ? এবার গন্তব্য কোথায় আর তা কতদূর ? সাত্যকি স্মিত হেসে বলল,
" আর কোথায় যাবো ? এখানেই তো আসা । এবার ব্যাক করব । "
শুনে ব্রহ্মতালু আমার আগুন হয়ে উঠল। মানে কি? এই এতোদূর ঠেঁঙিয়ে ও আমায় স্রেফ এই বালির স্তুপ আর কালীবাড়ি দেখাতে নিয়ে এসেছে । আমার ভক্তি, ভয় , প্রেম সব নিমেষে মাথায় উঠল । রাগে দাঁতে দাঁত পিষলাম। ফেরার সময় পাশে হাঁটতে হাটতে , বকবক করতে করতে সাত্যকি খেয়াল ই করল না আমার ভাবান্তর , মুখের কাঠিন্য , বা আমার সহসা নীরব অনুগমন । হয়তো ভেবেছিল , মায়ের আশীর্বাদে, আজ থেকেই হবু বৌ তার ভীষণ রকম বাধ্য হয়ে গেল।
সিমলাগড় স্টেশনে যখন এসে পৌঁছলাম , তখন সূর্য পাটে বসেছেন । গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে আলোর মাদুর একটু একটু করে গুটিয়ে নিচ্ছেন। একটা ফাঁকা বেঞ্চিতে দুজনে পাশাপাশি বসলাম । সাত্যকি আমার একটি হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে গাঢ় চোখে তাকাল । চারপাশে সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসছে , পাশে মনের মানুষের চোখে উথলিত প্রেম। এই মুহূর্তটুকুর জন্য আমি হাজার বছর হাঁটতে পারি , আমি আমার সমস্ত ভয়কে জয় করতে পারি । কিন্তু যেটা কোনোমতেই উপেক্ষা করতে পারি না তা হল মশার কামড় । ঝাঁকে ঝাঁকে মশা এসে তখন আমাকেই যেন তাদের প্রধান খাদ্যবস্তু হিসেবে পেয়েছে । আমি এক হাতে ক্রমাগত পা চুলকাতে লাগলাম। সাত্যকি আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল,
" ওরকম শাড়ি তুলে খ্যাস খ্যাস করে পা চুলকোচ্ছ কেন? "
আহা, কি ভাষা ! পলকে আমার যাবতীয় ভালোলাগা উবে গেল। আমি ততোধিক রুক্ষ ভাবে খিঁচিয়ে উঠলাম,
" দেখছ না কি ভীষণ মশা কামড়াচ্ছে । "
"আমাকেও তো কামড়াচ্ছে , আমি ওরকম করে অসভ্যের মতো প চুলকোচ্ছি? "
কি? আমি অসভ্য ? ওনার না হয় গণ্ডারের চামড়া , আমার তো নয় । দাঁড়াও না চাঁদু , একবার ট্রেনে ওঠো , তারপর তোমার কি হাল করি দেখো । এ বদ্যির মেয়েকে তো চেনো না । ভাবতে ভাবেতেই ডাউন বর্ধমান লোকাল এসে গেল । দুজনে ট্রেনে উঠে বসলাম । ফাঁকা ট্রেন । আমি অপেক্ষা করছি , সুযোগের । তা সুযোগ এলো, চাঁটিমারা চানাচুরওয়ালার রূপ ধরে। খিদে পেয়েছে বলাতে , সাত্যকি তাকে ডেকে দু ঠোঙা চানাচুর কিনল । আমি ততোক্ষণ তারিয়ে তারিয়ে চানাচুর খেলাম , যতক্ষণ না লজেন্সওয়ালা আসছে । তার দেখা পেতেই , ঠোঙা খালি করে , জানলা গলিয়ে সেটি ফেলে আদুরে গলায় বললাম,
" লজেন্স খাবো। "
সাত্যকি বোধহয় ভাবল , আমার ঝাল লেগেছে । ও আর কি করে জানবে আমি তখন খালি মুখে কাঁচালঙ্কা কচকচিয়ে চিবিয়ে খেতে পারি । সাত্যকি লজেন্সওয়ালা কে ডেকে এক প্যাকেট বিভিন্ন স্বাদের লজেন্স কিনে আমার হাতে দিল। লোকে লজেঞ্চুস চুষে চুষে খায় , আমি খাই কড়মড়িয়ে। কেন? খুব সহজ কথা, তাহলে পরেরটা তাড়াতাড়ি খেতে পারব। ছোটোবেলা থেকেই আমার এ অভ্যেস। কিন্তু আমার প্রেমিকটি তো আর তা জানে না । ও হাঁ করে আমার পরপর অতগুলো লজেন্স খাওয়া দেখল, কিছু বলল না।
এবার এলো ঝালবাদাম। নির্বিকার মুখে আদেশ করলাম,
" ঝালবাদাম কিনে দাও "
সাত্যকি খুব বিস্ময়ের সঙ্গে বলল,
" এই তো চানাচুর খেলে, অতগুলো লজেন্স খেলে , এখনো খিদে আছে ?"
" ঝালবাদাম খাবো। "
সাত্যকি কি আর করে, বিরস মুখে আমায় ঝালবাদাম কিনে দিল। বুঝলাম , আজ ভগবান আমার সহায় । পরের স্টেশনেই আবার আর এক লজেন্স ওয়ালা উঠল, চ্যবনপ্রাশ লজেন্স , আমার অতি অপছন্দের। কিন্তু তখন উও ভি অচ্ছা । এবার আমিই তাকে ডেকে আবার একপ্যাকেট লজেন্স নিয়ে ইশারায় সাত্যকিকে দেখিয়ে দিলাম। সে কি আর করে ব্যাজার মুখে দাম দিয়ে দিল।কারুর মুখে কোনো কথা নেই । সাত্যকি জানলার বাইরে তাকিয়ে অন্ধকার দেখছে , আর আমি প্রচণ্ড চেষ্টায় একের পর এক অখাদ্য চিবিয়ে চলেছি ।
আদিসপ্তগ্রামে উঠল এক শশাওয়ালা। তাকেও আমিই হাঁক পাড়লাম । সাত্যকি এবার স্পষ্টতই দারুন বিরক্ত। দেখলাম ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের উল্টো দিকে বসা সহযাত্রী ভদ্রলোক আমায় নিশ্চই এতোক্ষণে পাগল বা বিশ্ব হ্যাংলা ঠাউরেছেন। সে ভাবুন গিয়ে , তাঁর সাথে আমার কিই বা সম্পর্ক। জীবনে হয়তো ওনার সাথে আর দেখাই হবে না । কিন্তু সাত্যকির সাথে তো চিরজীবন কাটাতে হবে। এ বান্দাকে আজ একটু শিক্ষে না দিলে তো চলছে না ।
শশা খেতে খেতে বুঝলাম প্রচণ্ড অম্বলে গলা বুক জ্বালা করছে । সাত্যকিকে জব্দ করতে গিয়ে আমার হালুয়া পুরি টাইট হবার অবস্থা। হুগলীতে এক কলাওয়ালা উঠল। তাকে দেখতে পেয়েই সাত্যকি ওর শ্বদন্ত বার করে হেসে বললে,
" এবার কলা খাবে ? কলা ? ডাকি ? "
ওর হাসিটা কিরকম যেন ভয়ঙ্কর দেখাল। আমাদের সহযাত্রী টি ফিকফিক করে হাসছেন। আমি ভুরু কুঁচকে একটু ভাবলাম । মনে মনে ওই লোকটার সামনে খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে কলা খাওয়ার দৃশ্যটা কল্পনা করে তেমন ভদ্রস্থ মনে হল না । তারউপর একখানি চোঁয়াঢেকুর গলা জ্বালিয়ে আমায় সাবধান করে দিলে, " বহুত হো গিয়া , কাফি হো গিয়া , ব্যস । " আমি পরম কৃপা দৃষ্টিতে সাত্যকিকে অভিষিক্ত করে বললাম ,
" থাক । আর কিছু খাওয়াতে হবে না । আবার অন্যদিন খাইয়ো । "
সাত্যকি দাঁত কিড়মিড় করে , কি সব বিড়বিড় করতে করতে মুখ ঘুরিয়ে নিলে। কি একটা খাওয়ানোর কথা বলছিল যেন, সঠিক শুনতে পেলাম না, তবে খানিক টা বোধহয় আন্দাজ করতে পারি ।
চন্দননগরে পৌঁছে সভয়ে শুধোলাম,
" আমায় বাড়ি পৌঁছে দেবে তো ? "
সাত্যকি গম্ভীর গলায় বলল,
" তাই তো কথা ছিল । "
বাড়ি ঢুকেই সাত্যকিকে বাবার জিম্মায় বসিয়ে, হাত পা ধুয়ে, তাড়াতাড়ি ওর জন্য ডবল ডিমের ফ্রেঞ্চ টোস্ট বানিয়ে আনলাম। ফরাশ ডাঙার ছেলের যদি এতে রাগ একটু পড়ে । সঙ্গে এক কাপ ধূমায়িত ফেনিল কফি। বাবা কোনো একজন কে উপহার দেবেন বলে , ছবি আঁকছিলেন, "শ্রী রাধার মানভঞ্জন "। হাতের তুলিটা প্যালেটের উপর রেখে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন,
" কোথায় বেড়িয়ে এলি? "
আমি বললাম, 'সিমলাগড় '।
বাবা খুব বিস্ময়ের সাথে বললেন,
" আচ্ছা ! তা কি দেখলি সেখানে ? "
আমি বাবার চোখে চোখ রেখে ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললাম,
" বালি আর কালী । "
বাবার ভুরুটা কুঁচকে উঠল , ঠোঁটে টেপা হাসি। বললেন,
" সাত্যকি , তুমি বাবা খাবার গুলো একটু দেখে শুনে খাও, কেমন? "
সাত্যকি সবে একটা ফ্রেঞ্চ টোস্টে কামড় বসাতে গেছে , একটু থমকাল, তারপর হো হো করে হেসে উঠল, বলল,
" সে ভয়ে কম্পিত নয় বীরের হৃদয় । "
বলল বটে , তবে খুব সন্তর্পণে ফ্রেঞ্চ টোস্টে কামড় বসাল। কফিটাও একবার পরখ করে নিয়ে আত্মবিশ্বাসের গলায় বলল,
" পারফেক্টলি অলরাইট । "
বাবা খুব আতঙ্কের গলায় বললেন,
" তাহলে তো আরো চিন্তার কথা। "
আমি বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বললাম ,
" সে সব পর্ব চুকে গেছে । "
বলে আমার শোধ নেওয়ার কাহিনী সবিস্তারে শোনালাম।
বাবা আমার কানটা আলতো করে মুলে দিয়ে , হবু জামাই এর আপাত ভবিষ্যতের নিরাপত্তা সম্পর্কে খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে আবার ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করলেন।
অলক্ষ্যে বিধাতাপুরুষ মুচকি হাসলেন ।
তখন সাত্যকির সাথে আমার প্রেমপর্বের একেবারে গোড়ার দিক। এরমধ্যে একদিন দুজনে সিনেমা দেখে এলাম, মিঃ নটবরলাল, হুগলীর মিলন সিনেমাহলে। জানিনা সে হল এখনো টিকে আছে কিনা। সে কতদিন আগের কথা , আজকের ?
সেদিন , দুজনের চন্দননগর আপ প্ল্যাটফর্মে দেখা করার কথা, সাত্যকিই ট্রেনের টিকিট কেটে আনবে। আমার বাড়ি স্টেশন থেকে মিনিট পাঁচেকের পথ। বাবা মা এক আত্মীয়ের ওখানে উত্তরপাড়ায় গেছেন। আমি ফাঁকা বাড়িতে থেকে থেকে বোর হচ্ছিলাম বলে, না জীবনের প্রথম অভিসার যাকে আমাদের ছেলেপুলেরা ডেট বলে, তাইতে যাচ্ছি বলে মনের ভিতর চরম উত্তেজনার জন্যই হয়তো সময়ের একটু আগে এসেই উপস্থিত হয়েছিলাম। আমার কেন জানি মনে হয়েছিল, সাত্যকিও আমার মতোই উতলা হয়ে হয়তো আমার আগেই এসে দাঁড়িয়ে থাকবে। ওমা কোথায় কি! কুঞ্জবন মানে প্ল্যাটফর্ম তো সাত্যকি শূণ্য। হায় গো, তখন কি আর জানতাম, আমার প্রেমিকপ্রবর একটি লেটলতিফ । এই শুরু হল আমার প্রতীক্ষার অধ্যায় , এরপরে বিয়ের আগে , বিয়ের দিন এবং বিবাহের পরবর্তী কালে এ শবরীর প্রতীক্ষা আমার বলবৎ ই থাকবে।
নির্দিষ্ট সময় পেড়িয়ে যাওয়ার আধঘণ্টা পর , যখন আশেপাশের প্রচুর চেনা অচেনা মানুষের মাঝে স্থানকাল বোধ হীন আমি ক্রমাগত চোখের জল মুছছি, আর বাড়ি ফিরে যাব কিনা ভাবছি, তখন দেখি পাবলিক আসছেন, হন্তদন্ত হয়ে, কপালে প্রবল ভ্রুকুটি । যেন আমি ই দেরী করে ফেলেছি, কিম্বা যেন গোটা পৃথিবী এক দারুণ ষড়যন্ত্র করে ওর বিলম্ব ঘটিয়েছে। অভিমান প্রকাশ করার আগেই পরের ট্রেন এসে গেল। এ ট্রেন মিস করলে আর সিনেমা দেখা হয় না। সুতরাং চোখের জল মুছে ট্রেনে উঠে পরলাম। তাকিয়ে দেখি , রাগ করব কি, বাবু নিজেই ভীষণ রকম চটে আছেন, আমার উপর, না নিজের উপর, না তাবৎ বিশ্বসংসারের উপর , সঠিক বোধগম্য হল না।
সিনেমার টিকিট সাত্যকিই কাটল ড্রেস সার্কেলে । বুঝলাম খরচের ব্যাপারে ছোকরা বিন্দাস। সে অবিশ্যি, এতো বছরে ভালোই টের পেয়েছি। আমরা সপরিবারে ভ্রমণের সুযোগ হয়তো কম ই পেয়েছি , কিন্তু যেটুকু ঘুরেছি, আরাম ও স্বাচ্ছন্দের কোনো ত্রুটি রাখেনি সাত্যকি।
দুটিতে মিলে সিনেমা দেখতে তো বসলাম, কিন্তু আমি সিনেমা দেখব কি, কাঁটা হয়ে বসে আছি । ও যদি অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অসভ্যতা করে, তদ্দন্ডেই একটি চড় কষিয়ে বেরিয়ে আসব । না: ছেলে ভালো। আমার একখানি হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে দিব্যি সিনেমার গল্পের মধ্যে ডুবে গেল । আর আমি ? ওর গা থেকে ভেসে আসা কি এক অচেনা পুরুষালি সৌরভে আবিষ্ট আমি , ওর হাতের মধ্যে যেন নিজের হৃদয়ের সমস্তটুকু উজাড় করে দিয়ে , আচ্ছন্নের মতো বসে রইলাম। রেখা অমিতাভের নাচা গানা, গল্পের বিষয়বস্তু কিছুই মগজে ঢুকল না।
সেদিন ওখান থেকে ফিরে চুঁচড়োর ঘড়িরমোড়ের টাওয়ার ভিউতে মোগলাই খেয়েছিলাম। এবারে দাম দেবার পালা আমার । এটা আমারই সিদ্ধান্ত । যদিও সাত্যকি তখন ব্যাঙ্কে চাকরী করছে , আর আমার আর্থিক আমদানি বলতে , আমার পা খরচ অর্থাৎ রিক্সাভাড়া , বাড়ি থেকে কলেজ যাতায়াত আমি হন্টনে ম্যানেজ করে যা জমিয়ে রাখতাম , সেটুকু যত সামান্য ই হোক, আমার স্বাভিমান বজায় রাখার পক্ষে যথেষ্ট ছিল ।
দু এক সপ্তাহ পরে, সাত্যকি বলল, " চলো রোববার সিমলাগড় যাই। যাবে? "
এ আবার বলতে হয়? সিমলাগড় নামটা খুব চেনা চেনা লাগলেও , জায়গাটার বিশেষত্ব কিছুতেই মনে পড়ল না । আমি সিমলা কখনো যাই নি। সেখানকার দর্শনীয় স্থান কি কি আছে জানা নেই। ভাবলাম, সিমলার মতো কিছু জবরদস্ত দর্শনীয় কিছু আছে হয়তো , কিম্বা গড় বা কেল্লা, বা ঐতিহাসিক কিছু স্থান, আমি আবার একটু ইতিহাসপ্রেমী কিনা। সাত্যকিকে জিজ্ঞেস করতে ঠিক সাহস হল না। জায়গা টি ট্রেনে বর্ধমান যাওয়ার পথেই পড়ে, এটুকু জানা আছে। সে তো কত স্টেশন ই আছে । সব কটি জায়গার বিশেষত্ব কি আর জানি ? কিন্তু আমার অতি পণ্ডিত , ভূগোলে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্থান অধিকারী স্নাতক প্রেমিক টি জানেন। তিনি আবার তখন আমার জিওগ্রাফি অনার্সের গৃহ শিক্ষক। বুরবকের মতো প্রশ্ন করে বকুনি খাই আর কি। সুতরাং " আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা , আমি যে পথ চিনিনে " টাইপ প্রেমে গদগদ আমি রাজি হয়ে গেলাম।
পরের রোববার আবার যথারীতি আমায় বেশ কিছুক্ষণ স্টেশনে দাঁড় করিয়ে তিনি এলেন, না এবারে আর বিরক্ত মুখে নয়, বরং দুগালে টোল ফেলে আমার হৃদয়জয়ী হাসি হেসে এলেন। ফাঁকা ট্রেনে গল্প করতে করতে কখন পৌঁছে গেলাম শিমলাগড়। স্টেশনে নেমে দেখি চতুর্দিকে বালি আর বালি । বালির পাহাড় একেবারে । মুখ দিয়ে আপনি প্রশ্ন বেরিয়ে এলো ,
" এতো বালি কেন? "
সাত্যকি একটু ও বিরক্ত না হয়ে বলল,
" জানো না ? এখানেই তো বালির খাদান। "
" অ"
জানতাম না জানা হল । এবার? সাত্যকি বলল,
" চল, দেখতে পাবে। "
স্টেশনের সামনে প্রচুর রিক্সা । ভাবলাম, একটায় উঠব বোধহয়। না:। সাত্যকি হাতের ইশারায় তাদের না করে দিলে। ঠিক হ্যায় । চল হাঁটি। যদিও হাঁটতে আমার কষ্টই হত, শুধু পয়সা বাঁচানোর তাগিদে ই হাঁটতাম। তবু সে অভ্যেস তো তখন ছিল। সুতরাং চওড়া বড় রাস্তায় , লম্বা লম্বা গাছের ছায়ায় শেষ অপরাহ্নের আলো গায়ে মেখে প্রেমিক যুগল পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। আহা কি রোমান্টিক দৃশ্য । আসলে দৃশ্য টা কিন্তু মোটেই তেমন রুমানী ছিল না । সাত্যকি আর আমার উচ্চতার ফারাক বেশী নয় , মাত্র এক ফুট । ওর এক কদম, মানে আমার চার কদম । তার উপর পায়ে আমার হাই হিল । ফলে ঐ উটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে আর তত ভালোবাসার মধু টের পাচ্ছিলাম না। এদিকে , হাঁটছি তো হাঁটছি । পাশে তিনি সমানে বালির ইতিহাস আউড়ে যাচ্ছেন । মনে মনে আতঙ্কিত হচ্ছি , একি রে বাবা , এ লোক কি সারাজীবন আমায় শুধু ভূগোল ই পড়িয়ে যাবে , দুটো প্রেমের কথা কইবে না। এই পথ যদি না শেষ হয় , ব্যাপার টা আর সহ্য করতে না পেরে , একটু খেঁকিয়েই জিজ্ঞাসা করলাম,
" আর কদ্দুর হাঁটতে হবে?
সাত্যকি বেশ উৎসাহ নিয়েই বলল,
" এই তো এসে গেছি । "
কোথায় এসে গেছি ? আশেপাশে কোনো বনবিতান, কোনো নদীর ধার , বা কোনো ঐতিহাসিক ইমারতের ধ্বংসবিশেষ কিছুই তো নজরে আসছে না। রাস্তার ডান দিকে এক কালী মন্দির। সাত্যকি সেখানে জোড় হাত করে দাঁড়িয়ে পড়ল । জানি ও খুব কালী ভক্ত । আমি আবার কৃষ্ণপূজারিণী । খর্গ হাতে লকলকে লোলজিহ্বা করালবদনী এই দেবী কে আমি কি এক অজ্ঞাত কারণে দারুণ ভয় পেতাম। এর আগে স্বইচ্ছায় কোনোদিন কোনো কালী মন্দিরে ভুলেও প্রবেশ করিনি । যদিও সেই আমি ই এখন আদ্যাশক্তির উপাসিকা । আমার জীবন এমনই। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে জীবন আমায় নিয়ে বিচিত্র খেলা খেলেছে।
সাত্যকিকে তদগতচিত্তে প্রণাম করতে দেখে , আমি ও ভয়ে ভয়ে হাতজোড় করে প্রণত হলাম। শুনলাম, দেবী খুব জাগ্রত । লোকে নতুন গাড়ি কিনে এখানে পুজো দিয়ে যায় । খুব ভালো। ভবিষ্যতে আমাদের চারচাকা কেনা হলে না হয় এখানে পুজো দেওয়া যাবেখন। কিন্তু এবার ? এবার গন্তব্য কোথায় আর তা কতদূর ? সাত্যকি স্মিত হেসে বলল,
" আর কোথায় যাবো ? এখানেই তো আসা । এবার ব্যাক করব । "
শুনে ব্রহ্মতালু আমার আগুন হয়ে উঠল। মানে কি? এই এতোদূর ঠেঁঙিয়ে ও আমায় স্রেফ এই বালির স্তুপ আর কালীবাড়ি দেখাতে নিয়ে এসেছে । আমার ভক্তি, ভয় , প্রেম সব নিমেষে মাথায় উঠল । রাগে দাঁতে দাঁত পিষলাম। ফেরার সময় পাশে হাঁটতে হাটতে , বকবক করতে করতে সাত্যকি খেয়াল ই করল না আমার ভাবান্তর , মুখের কাঠিন্য , বা আমার সহসা নীরব অনুগমন । হয়তো ভেবেছিল , মায়ের আশীর্বাদে, আজ থেকেই হবু বৌ তার ভীষণ রকম বাধ্য হয়ে গেল।
সিমলাগড় স্টেশনে যখন এসে পৌঁছলাম , তখন সূর্য পাটে বসেছেন । গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে আলোর মাদুর একটু একটু করে গুটিয়ে নিচ্ছেন। একটা ফাঁকা বেঞ্চিতে দুজনে পাশাপাশি বসলাম । সাত্যকি আমার একটি হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে গাঢ় চোখে তাকাল । চারপাশে সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসছে , পাশে মনের মানুষের চোখে উথলিত প্রেম। এই মুহূর্তটুকুর জন্য আমি হাজার বছর হাঁটতে পারি , আমি আমার সমস্ত ভয়কে জয় করতে পারি । কিন্তু যেটা কোনোমতেই উপেক্ষা করতে পারি না তা হল মশার কামড় । ঝাঁকে ঝাঁকে মশা এসে তখন আমাকেই যেন তাদের প্রধান খাদ্যবস্তু হিসেবে পেয়েছে । আমি এক হাতে ক্রমাগত পা চুলকাতে লাগলাম। সাত্যকি আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল,
" ওরকম শাড়ি তুলে খ্যাস খ্যাস করে পা চুলকোচ্ছ কেন? "
আহা, কি ভাষা ! পলকে আমার যাবতীয় ভালোলাগা উবে গেল। আমি ততোধিক রুক্ষ ভাবে খিঁচিয়ে উঠলাম,
" দেখছ না কি ভীষণ মশা কামড়াচ্ছে । "
"আমাকেও তো কামড়াচ্ছে , আমি ওরকম করে অসভ্যের মতো প চুলকোচ্ছি? "
কি? আমি অসভ্য ? ওনার না হয় গণ্ডারের চামড়া , আমার তো নয় । দাঁড়াও না চাঁদু , একবার ট্রেনে ওঠো , তারপর তোমার কি হাল করি দেখো । এ বদ্যির মেয়েকে তো চেনো না । ভাবতে ভাবেতেই ডাউন বর্ধমান লোকাল এসে গেল । দুজনে ট্রেনে উঠে বসলাম । ফাঁকা ট্রেন । আমি অপেক্ষা করছি , সুযোগের । তা সুযোগ এলো, চাঁটিমারা চানাচুরওয়ালার রূপ ধরে। খিদে পেয়েছে বলাতে , সাত্যকি তাকে ডেকে দু ঠোঙা চানাচুর কিনল । আমি ততোক্ষণ তারিয়ে তারিয়ে চানাচুর খেলাম , যতক্ষণ না লজেন্সওয়ালা আসছে । তার দেখা পেতেই , ঠোঙা খালি করে , জানলা গলিয়ে সেটি ফেলে আদুরে গলায় বললাম,
" লজেন্স খাবো। "
সাত্যকি বোধহয় ভাবল , আমার ঝাল লেগেছে । ও আর কি করে জানবে আমি তখন খালি মুখে কাঁচালঙ্কা কচকচিয়ে চিবিয়ে খেতে পারি । সাত্যকি লজেন্সওয়ালা কে ডেকে এক প্যাকেট বিভিন্ন স্বাদের লজেন্স কিনে আমার হাতে দিল। লোকে লজেঞ্চুস চুষে চুষে খায় , আমি খাই কড়মড়িয়ে। কেন? খুব সহজ কথা, তাহলে পরেরটা তাড়াতাড়ি খেতে পারব। ছোটোবেলা থেকেই আমার এ অভ্যেস। কিন্তু আমার প্রেমিকটি তো আর তা জানে না । ও হাঁ করে আমার পরপর অতগুলো লজেন্স খাওয়া দেখল, কিছু বলল না।
এবার এলো ঝালবাদাম। নির্বিকার মুখে আদেশ করলাম,
" ঝালবাদাম কিনে দাও "
সাত্যকি খুব বিস্ময়ের সঙ্গে বলল,
" এই তো চানাচুর খেলে, অতগুলো লজেন্স খেলে , এখনো খিদে আছে ?"
" ঝালবাদাম খাবো। "
সাত্যকি কি আর করে, বিরস মুখে আমায় ঝালবাদাম কিনে দিল। বুঝলাম , আজ ভগবান আমার সহায় । পরের স্টেশনেই আবার আর এক লজেন্স ওয়ালা উঠল, চ্যবনপ্রাশ লজেন্স , আমার অতি অপছন্দের। কিন্তু তখন উও ভি অচ্ছা । এবার আমিই তাকে ডেকে আবার একপ্যাকেট লজেন্স নিয়ে ইশারায় সাত্যকিকে দেখিয়ে দিলাম। সে কি আর করে ব্যাজার মুখে দাম দিয়ে দিল।কারুর মুখে কোনো কথা নেই । সাত্যকি জানলার বাইরে তাকিয়ে অন্ধকার দেখছে , আর আমি প্রচণ্ড চেষ্টায় একের পর এক অখাদ্য চিবিয়ে চলেছি ।
আদিসপ্তগ্রামে উঠল এক শশাওয়ালা। তাকেও আমিই হাঁক পাড়লাম । সাত্যকি এবার স্পষ্টতই দারুন বিরক্ত। দেখলাম ওর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। আমাদের উল্টো দিকে বসা সহযাত্রী ভদ্রলোক আমায় নিশ্চই এতোক্ষণে পাগল বা বিশ্ব হ্যাংলা ঠাউরেছেন। সে ভাবুন গিয়ে , তাঁর সাথে আমার কিই বা সম্পর্ক। জীবনে হয়তো ওনার সাথে আর দেখাই হবে না । কিন্তু সাত্যকির সাথে তো চিরজীবন কাটাতে হবে। এ বান্দাকে আজ একটু শিক্ষে না দিলে তো চলছে না ।
শশা খেতে খেতে বুঝলাম প্রচণ্ড অম্বলে গলা বুক জ্বালা করছে । সাত্যকিকে জব্দ করতে গিয়ে আমার হালুয়া পুরি টাইট হবার অবস্থা। হুগলীতে এক কলাওয়ালা উঠল। তাকে দেখতে পেয়েই সাত্যকি ওর শ্বদন্ত বার করে হেসে বললে,
" এবার কলা খাবে ? কলা ? ডাকি ? "
ওর হাসিটা কিরকম যেন ভয়ঙ্কর দেখাল। আমাদের সহযাত্রী টি ফিকফিক করে হাসছেন। আমি ভুরু কুঁচকে একটু ভাবলাম । মনে মনে ওই লোকটার সামনে খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে কলা খাওয়ার দৃশ্যটা কল্পনা করে তেমন ভদ্রস্থ মনে হল না । তারউপর একখানি চোঁয়াঢেকুর গলা জ্বালিয়ে আমায় সাবধান করে দিলে, " বহুত হো গিয়া , কাফি হো গিয়া , ব্যস । " আমি পরম কৃপা দৃষ্টিতে সাত্যকিকে অভিষিক্ত করে বললাম ,
" থাক । আর কিছু খাওয়াতে হবে না । আবার অন্যদিন খাইয়ো । "
সাত্যকি দাঁত কিড়মিড় করে , কি সব বিড়বিড় করতে করতে মুখ ঘুরিয়ে নিলে। কি একটা খাওয়ানোর কথা বলছিল যেন, সঠিক শুনতে পেলাম না, তবে খানিক টা বোধহয় আন্দাজ করতে পারি ।
চন্দননগরে পৌঁছে সভয়ে শুধোলাম,
" আমায় বাড়ি পৌঁছে দেবে তো ? "
সাত্যকি গম্ভীর গলায় বলল,
" তাই তো কথা ছিল । "
বাড়ি ঢুকেই সাত্যকিকে বাবার জিম্মায় বসিয়ে, হাত পা ধুয়ে, তাড়াতাড়ি ওর জন্য ডবল ডিমের ফ্রেঞ্চ টোস্ট বানিয়ে আনলাম। ফরাশ ডাঙার ছেলের যদি এতে রাগ একটু পড়ে । সঙ্গে এক কাপ ধূমায়িত ফেনিল কফি। বাবা কোনো একজন কে উপহার দেবেন বলে , ছবি আঁকছিলেন, "শ্রী রাধার মানভঞ্জন "। হাতের তুলিটা প্যালেটের উপর রেখে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন,
" কোথায় বেড়িয়ে এলি? "
আমি বললাম, 'সিমলাগড় '।
বাবা খুব বিস্ময়ের সাথে বললেন,
" আচ্ছা ! তা কি দেখলি সেখানে ? "
আমি বাবার চোখে চোখ রেখে ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললাম,
" বালি আর কালী । "
বাবার ভুরুটা কুঁচকে উঠল , ঠোঁটে টেপা হাসি। বললেন,
" সাত্যকি , তুমি বাবা খাবার গুলো একটু দেখে শুনে খাও, কেমন? "
সাত্যকি সবে একটা ফ্রেঞ্চ টোস্টে কামড় বসাতে গেছে , একটু থমকাল, তারপর হো হো করে হেসে উঠল, বলল,
" সে ভয়ে কম্পিত নয় বীরের হৃদয় । "
বলল বটে , তবে খুব সন্তর্পণে ফ্রেঞ্চ টোস্টে কামড় বসাল। কফিটাও একবার পরখ করে নিয়ে আত্মবিশ্বাসের গলায় বলল,
" পারফেক্টলি অলরাইট । "
বাবা খুব আতঙ্কের গলায় বললেন,
" তাহলে তো আরো চিন্তার কথা। "
আমি বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বললাম ,
" সে সব পর্ব চুকে গেছে । "
বলে আমার শোধ নেওয়ার কাহিনী সবিস্তারে শোনালাম।
বাবা আমার কানটা আলতো করে মুলে দিয়ে , হবু জামাই এর আপাত ভবিষ্যতের নিরাপত্তা সম্পর্কে খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে আবার ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করলেন।
অলক্ষ্যে বিধাতাপুরুষ মুচকি হাসলেন ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন