শয়তানচরিত – ১

(সুমিত রায়)

(মুখফোড়ের স্যাটায়ার দেখিয়া অনুপ্রাণিত হইয়া শুরু করিলাম...)
স্বর্গে সূর্য প্রায় অস্তমিত। পাখপাখালির কলকাকলিতে সন্ধ্যার আকাশ মুখরিত। আদম সরাইখানার ইয়ার-বকশী লইয়া দুইখানা টেবিল একত্রে জোড়া লাগাইয়া খোশগল্প গুলজার করিতেছে। 

আদম একখানা মৃৎপাত্র ভর্তি শরবত চুমুক দিবার লাগি ক্রমশ তাহাকে ওষ্ঠের নিকট আনিতে যাইবেন, অমনি এক গগণবিদারী আওয়াজে সমস্ত স্বর্গ কাঁপিয়া উঠিল। ইহার ফলে আদমের টেবিলদ্বয়ের একখানা পায়া ভাঙ্গিয়া পড়িয়া যায়। আদম “ও মোর খোদা” বলিয়া ভগ্ন পায়া হাতে লইয়া টেবিলের পাদদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। রশ্মিনির্মিত সমস্ত ইয়ার-বকশী দেবদূতগণের মাঝে একমাত্র আদমই মৃত্তিকানির্মিত ও নাজুক।

চারিদিকে প্রবল উচ্চবাচ্য শুরু হইলে তদন্ত কমিটি বাহির করিল, একখানা ছাগ তাহার গণ্ডদেশে গ্রেনেড বাঁধিয়া লইয়া সরাইখানায় আত্মঘাতি হামলা চালাইয়াছে। বিষ্ফোরণের পর ছাগটির কেবলমাত্র দন্তপাটি ও শৃঙ্গদ্বয় অবিকৃত রহিয়াছে। চারিপাশে ক্রন্দনধ্বনি শ্রুত হইল। কেহ কাঁদিল সাধের সরাইখানার ভগ্নদশা দেখিয়া, কেহ কাঁদিল ইক্ষুরসের পাত্র উল্টাইতে দেখিয়া, কেহ কাঁদিল নিরীহ ছাগের মৃত্যুসংবাদ শুনিয়া।

পরবর্তী দিবসে ছাগ-আক্রমণ আরও বৃদ্ধি পাইল। ছাগেরা তাহাদিগের গণ্ডদেশে গ্রেনেড ঝুলাইয়া ম্যাৎকারে “ঈশ্বর সবচাইতে মহান” বলিয়া (আরব্যভাষায় আল্লাহু আকবার) একে একে স্বর্গোদ্যানের বিভিন্ন প্রান্তে, জায়হুন নদী তীরবর্তী প্রমোদোদ্যানে, দেবদূতগণের দেবদূতাবাসে, এমনকি ঈভের সাজঘরেও আত্মঘাতি হামলা চালাইল। সকলে বিড়বিড় করিয়া কহিতে লাগিল, ইহা নিশ্চয় শয়তানের কার্য, নিশ্চয় শয়তান এইসমস্ত নিরীহ ছাগজাতিকে ফুসলাইয়া আত্মঘাতি বানাইতেছে। অথচ কোন স্থানেই শয়তানকে দেখিতে পাওয়া গেল না। ঈশ্বর ক্ষেপিয়া গিয়া কহিলেন, ‘আত্মঘাতি হইবি হ, কিন্তু মরিবার পূর্বে আমার মহত্ত্ব ঘোষণা করিয়া আমারে জড়াইবার নিমিত্ত কী? কাহারও মনে কি সন্দেহ প্রবেশ করিয়াছে যে, আমি সবচাইতে মহান নই!?!’।

পরবর্তী দিবসে স্বয়ং ঈশ্বরও রেহাই পাইলেন না। ঈশ্বর তাহার প্রিয় পুষ্করিণীতীরে স্বর্গের রশ্মিনির্মিত ললনাদিগের সহিত লীলাক্রীড়ায় মগ্ন ছিলেন। এমতাবস্থায় একখানা অতিশয় নির্ভিক ছাগ ঈশ্বরের আরশে আত্মঘাতি হামলা করিয়া বসিল। তাহাতে ঈশ্বরের আরশ ফাটিয়া চৌচির হইয়া যায়। গিবরিল কহিল, এইবারে এই ছাগ আত্মঘাতি হামলার পূর্বে শয়তানের আশীর্বাদ লইয়া আসিয়াছিল, এবং এইবারও নাকি ওই ছাগ আত্মঘাতি হামলায় মরিবার পূর্বে “ঈশ্বর সবচাইতে মহান” ঘোষণা করিয়া যায়। ইহা শুনিয়া ঈশ্বর প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত হইলেন, ইহার কারণ তাহার চৌচির হওয়া আরশ ছিল না, বারংবার “ঈশ্বর সবচাইতে মহান” শুনিতে শুনিতে তাঁহার মাঝেও তাঁহার মহত্ত্ব বিষয়ে একরকম সন্দেহবাদিতার সৃষ্টি হয়।

ক্রোধ ক্রমশ বৃদ্ধি পাইলে, হঠাৎ নিকটে একখানা তৃণ-ভক্ষণরত ছাগ দেখিয়া ঈশ্বর অতিশীঘ্র তাহাকে বন্দী করিবার আদেশ করিলেন। ঈশ্বর ছাগটিকে তাহার জঙ্গিবাদ যোগসূত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিল। কিন্তু ছাগটি কেবলি ঈশ্বরের পানে ফ্যালফ্যাল করিয়া তাকাইয়া থাকে এবং মুখগহ্বরে থাকা তৃণ চর্বণ করিয়া যায়। ঈশ্বর আরও ক্রুদ্ধ হইলে ভীত হইয়া ছাগটি ল্যাদাইতে ও ম্যাৎকার করিতে আরম্ভ করে। এই দেখিয়া গিবরিল ছাগটির বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষা করিবার নিমিত্তে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, ‘বলিতে পার কি, সমগ্র ভূলোকে, দ্যুলোকে কে সবচাইতে মহান?’ প্রশ্ন শুনিয়া ছাগ ম্যাৎকারে কহিয়া ফেলে “ঈশ্বর সবচাইতে মহান”। কিন্তু পুনর্বার এই কথাটি শুনিয়া ঈশ্বর ক্ষেপিয়া আস্ফালন করিয়া বসিল। ইহাতে ভয় পাইয়া হৃদযন্ত্র বিকল হইয়া ছাগটি মৃত্যুবরণ করিল।

ইহার পর ছাগদিগের আত্মঘাতি হামলা আর দেখা যায় নাই, এমনকি কোন ছাগকেও আর দেখা যায় নাই। কিন্তু জনৈক দেবদূতকে স্বর্গোদ্যানে বসিয়া বারংবার ক্রন্দন করিতে দেখা গেল। নাম জিজ্ঞাসা করিলে তিনি উত্তর দেন, তাহার নাম ‘ফখরিল’।

ক্রন্দনের কারণ জানিতে চাওয়া হইলে তিনি উত্তর করেন, তিনি একখানা ছাগখামারের কর্তা ছিলেন। অতিশয় যত্নের সহিত তিনি তাহার ছাগদিগকে কাঁঠালপত্র ভক্ষণ করাইতেন, কাঁঠালপত্র খাওয়াইয়া খাওয়াইয়া তিনি ছাগদিগকে অতিশয় হৃষ্টপুষ্ট করিয়া তুলিয়াছিলেন। অতঃপর একদিন তাহার গৃহে শয়তান প্রবেশ করে। শয়তানকে তিনি অতিশয় খাতির-যত্ন করিয়া চৌকিতে বসিতে দেন, আদর আপ্যায়ন করিয়া তাহাকে পিঠা-পায়েস খাইতে দেন। খাইবার পর ঢেকুর ছাড়িয়া শয়তান কহেন, “ওহে ফখরিল, আর কতদিনই বা ছাগদিগকে খামারে আবদ্ধ করিয়া রাখিবে? উহাদের খামার হইতে স্বর্গের মুক্ত প্রকৃতিতে ছাড়িয়া দাও। তাহারা স্বর্গোদ্যানে ল্যাদাইলে ও ম্যাৎকার করিলে স্বর্গের শোভাবর্ধন হইবে”। শুনিয়া আবেগাপ্লুত ফখরিলের আঁখি ছলছল হইয়া ওঠে এবং তৎক্ষণাৎ তিনি তাহার সমগ্র ছাগকুলকে স্বর্গের মুক্ত প্রকৃতিতে ছাড়িয়া দেন। ইহার পর তিনি শয়তান বা তার ছাগ, কাউকেই আর খুঁজিয়া পান নাই।

তাহার কথা শুনিয়া সকলে একে অপরের মুখের দিকে চাহিল। অতঃপর ফখরিলকে সম্প্রতি স্বর্গে ঘটা জঙ্গি হামলাসমূহ সম্পর্কে মতামত জিজ্ঞাসা করা হইলে, তিনি ছলছল নয়নে কহিলেন, “ইহা ঈশ্বরের এক গভীর ষড়যন্ত্র। ঈশ্বর আমার ছাগদিগকে তুলিয়া লইয়া তাহাদিগকে জঙ্গি বানাইয়া হত্যা করিয়াছে”!!!
ফখরিলের কথা শুনিয়া সকলে তাহাকে নিভৃতে রাখিয়া চলিয়া যায়। ফখরিলের ক্রন্দনধ্বনি দিগ্বিদিকে ছড়াইয়া যাইতে লাগিল।

আলোচ্য ঘটনার সহিত কেহ অন্য কোন ঘটনা বা খবরের মিল খুঁজিয়া পাইলে কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকিবে না। বিশেষ করিয়া কমেন্টবক্সে উল্লিখিত খবরটির ক্ষেত্রে তো একেবারেই নহে...

মন্তব্যসমূহ