(সুমিত রায়)
দর্শন, বিশেষ করে সাম্প্রতিক ফরাসী দার্শনিক ধারা একই সাথে উত্তরাধুনিকতাবাদ বা পোস্টমডারনিজম সংক্রান্ত বিতর্কের প্রধান ক্ষেত্র এবং উত্তরাধুনিকতাবাদকে গঠন করে এমন অনেক তত্ত্বের উৎস্য হয়ে উঠেছে। সম্ভবত এক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি হলেন জ্যাঁ ফ্রাংকোইস লিওটার্ড, যার বই দ্য পোস্টমডার্ন কন্ডিশন: এ রিপোর্ট অন নলেজ (১৯৭৯) কে উত্তরাধুনিকতাবাদের সবচাইতে শক্তিশালী তাত্বিক প্রকাশ হিসেবে ধরা হয়। লিওটার্ডের কথা হচ্ছে, আমাদেরকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির গ্র্যান্ড ন্যারেটিভসকে (অর্থাৎ, সার্বজনীন তত্ত্বগুলোকে) বর্জন করা উচিৎ, কারণ তারা সবাই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। লিওটার্ডের এই কথাটি এবং কর্তৃত্বকে তার সকল রূপ সহ ঘৃণা, উভয় মিলেই উত্তরাধুনিকতাবাদের তত্ত্বকে তৈরি করে। পূর্বের তত্ত্বগুলোকে, (যেমন মার্ক্সবাদ) নিয়ে বিতর্ক করে কোন লাভ নেই। বরং আমাদের সেগুলো এড়িয়ে চলা উচিৎ কারণ সেগুলো এখন আমাদের জীবনের জন্য অপ্রাসঙ্গিক। উত্তরাধুনিক দর্শন আমাদেরকে সেইসব যুক্তি এবং কৌশল প্রদান করে যা আমাদেরকে ভিন্নমত পোষণের সংকেত দেয়, এবং একইসাথে কিভাবে সকল প্রকার কর্তৃত্বের অনুপস্থিতিতে ভেল্যু জাজমেন্ট বা মূল্যের বিচার করতে হয় তা শেখায়।
উত্তরাধুনিকতাবাদকে একটি দার্শনিক আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করার জন্য সবচাইতে ভাল উপায়গুলোর মধ্যে একটি হল একে স্কেপটিসিজম বা সংশয়বাদের একটি ধরণ হিসেবে বর্ণনা করা। এখানে এই সংশয়বাদ হল কর্তৃত্ব, অর্জিত জ্ঞান, রাজনৈতিক আচার প্রভৃতি সম্পর্কে সংশয়বাদ। আর এই সংশয়বাদই উত্তরাধুনিকতাবাদকে একটি বিস্তৃত এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা পাশ্চাত্য চিন্তাধারার ঐতিহ্যে ফেলে যা আমাদেরকে একেবারে ক্লাসিকাল বা চিরায়ত গ্রীক দর্শনের কাছে নিয়ে যায়। সংশয়বাদ হচ্ছে দর্শনের একটি নেতিবাচক বা ঋণাত্মক ধরণ। যেসব দার্শনিক-তত্ত্বকে চূড়ান্ত সত্য বলে দাবী করা হয়, অথবা চূড়ান্ত সত্য আবিষ্কার করার পথ হিসেবে দাবী করা হয়, সংশয়বাদ তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এরকম দর্শনের রীতিকে বর্ণনা করার জন্য প্রায়োগিক শব্দটি হল “অ্যান্টিফাউন্ডেশনাল”। অ্যান্টিফাউন্ডেশনালিস্টগণ কোন আলোচনার ফাউন্ডেশন বা ভিত্তির সঠিকতা নিয়ে বিতর্ক করেন, তারা প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ফাউন্ডেশন বা ভিত্তির সত্যতার নিশ্চয়তা কী?’। উত্তরাধুনিকতাবাদ খুব জোড়ের সাথেই অ্যান্টিফাউন্ডেশনালিস্ট দার্শনিকগণের কথার উদাহরণ টানেন। সম্ভবত এদের মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত হলেন ঊনিশ শতকের আইকনোক্লাস্টিক জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিচা (Friedrich Nietzsche), যার ‘revaluation of all values’ বা ‘সকল মূল্যের পুনর্মূল্যায়ন” এর ডাকই উত্তরাধুনিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে। উত্তরাধুনিকতাবাদের সাথে জড়িত সংশয়বাদ নিয়ে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনার পূর্বে সম্ভবত এটা আলোচনা করা সুবিধাজনক হবে যে, কাদেরকে এবং কোন বিষয়গুলোকে উত্তরাধুনিক দর্শনের ছায়ায় ফেলা যায়। এখানে কেবল লিওটার্ডের মত উত্তরাধুনিক চিন্তাবিদদেরকেই আনা হবে না, সেই সাথে বিভিন্ন বিষয়কেও আনা হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় “ডিকনস্ট্রাকশন”। এটি পোস্টস্ট্রাকচারালিজম এর অধীনে থাকা একটি বিষয়।
(চলবে)
দর্শন, বিশেষ করে সাম্প্রতিক ফরাসী দার্শনিক ধারা একই সাথে উত্তরাধুনিকতাবাদ বা পোস্টমডারনিজম সংক্রান্ত বিতর্কের প্রধান ক্ষেত্র এবং উত্তরাধুনিকতাবাদকে গঠন করে এমন অনেক তত্ত্বের উৎস্য হয়ে উঠেছে। সম্ভবত এক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি হলেন জ্যাঁ ফ্রাংকোইস লিওটার্ড, যার বই দ্য পোস্টমডার্ন কন্ডিশন: এ রিপোর্ট অন নলেজ (১৯৭৯) কে উত্তরাধুনিকতাবাদের সবচাইতে শক্তিশালী তাত্বিক প্রকাশ হিসেবে ধরা হয়। লিওটার্ডের কথা হচ্ছে, আমাদেরকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির গ্র্যান্ড ন্যারেটিভসকে (অর্থাৎ, সার্বজনীন তত্ত্বগুলোকে) বর্জন করা উচিৎ, কারণ তারা সবাই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। লিওটার্ডের এই কথাটি এবং কর্তৃত্বকে তার সকল রূপ সহ ঘৃণা, উভয় মিলেই উত্তরাধুনিকতাবাদের তত্ত্বকে তৈরি করে। পূর্বের তত্ত্বগুলোকে, (যেমন মার্ক্সবাদ) নিয়ে বিতর্ক করে কোন লাভ নেই। বরং আমাদের সেগুলো এড়িয়ে চলা উচিৎ কারণ সেগুলো এখন আমাদের জীবনের জন্য অপ্রাসঙ্গিক। উত্তরাধুনিক দর্শন আমাদেরকে সেইসব যুক্তি এবং কৌশল প্রদান করে যা আমাদেরকে ভিন্নমত পোষণের সংকেত দেয়, এবং একইসাথে কিভাবে সকল প্রকার কর্তৃত্বের অনুপস্থিতিতে ভেল্যু জাজমেন্ট বা মূল্যের বিচার করতে হয় তা শেখায়।
উত্তরাধুনিকতাবাদকে একটি দার্শনিক আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করার জন্য সবচাইতে ভাল উপায়গুলোর মধ্যে একটি হল একে স্কেপটিসিজম বা সংশয়বাদের একটি ধরণ হিসেবে বর্ণনা করা। এখানে এই সংশয়বাদ হল কর্তৃত্ব, অর্জিত জ্ঞান, রাজনৈতিক আচার প্রভৃতি সম্পর্কে সংশয়বাদ। আর এই সংশয়বাদই উত্তরাধুনিকতাবাদকে একটি বিস্তৃত এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা পাশ্চাত্য চিন্তাধারার ঐতিহ্যে ফেলে যা আমাদেরকে একেবারে ক্লাসিকাল বা চিরায়ত গ্রীক দর্শনের কাছে নিয়ে যায়। সংশয়বাদ হচ্ছে দর্শনের একটি নেতিবাচক বা ঋণাত্মক ধরণ। যেসব দার্শনিক-তত্ত্বকে চূড়ান্ত সত্য বলে দাবী করা হয়, অথবা চূড়ান্ত সত্য আবিষ্কার করার পথ হিসেবে দাবী করা হয়, সংশয়বাদ তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এরকম দর্শনের রীতিকে বর্ণনা করার জন্য প্রায়োগিক শব্দটি হল “অ্যান্টিফাউন্ডেশনাল”। অ্যান্টিফাউন্ডেশনালিস্টগণ কোন আলোচনার ফাউন্ডেশন বা ভিত্তির সঠিকতা নিয়ে বিতর্ক করেন, তারা প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ফাউন্ডেশন বা ভিত্তির সত্যতার নিশ্চয়তা কী?’। উত্তরাধুনিকতাবাদ খুব জোড়ের সাথেই অ্যান্টিফাউন্ডেশনালিস্ট দার্শনিকগণের কথার উদাহরণ টানেন। সম্ভবত এদের মধ্যে সবচাইতে বিখ্যাত হলেন ঊনিশ শতকের আইকনোক্লাস্টিক জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক নিচা (Friedrich Nietzsche), যার ‘revaluation of all values’ বা ‘সকল মূল্যের পুনর্মূল্যায়ন” এর ডাকই উত্তরাধুনিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে। উত্তরাধুনিকতাবাদের সাথে জড়িত সংশয়বাদ নিয়ে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনার পূর্বে সম্ভবত এটা আলোচনা করা সুবিধাজনক হবে যে, কাদেরকে এবং কোন বিষয়গুলোকে উত্তরাধুনিক দর্শনের ছায়ায় ফেলা যায়। এখানে কেবল লিওটার্ডের মত উত্তরাধুনিক চিন্তাবিদদেরকেই আনা হবে না, সেই সাথে বিভিন্ন বিষয়কেও আনা হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় “ডিকনস্ট্রাকশন”। এটি পোস্টস্ট্রাকচারালিজম এর অধীনে থাকা একটি বিষয়।
(চলবে)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন