উত্তরাধুনিকতাবাদ এবং দর্শন - স্টুয়ার্ট সিম (দ্বিতীয় পর্ব)

(সুমিত রায়)

চিন্তার স্ট্রাকচারালিস্ট ধারাকে পোস্টস্ট্রাকচারালিজমের দ্বারা প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে গৃহীত কর্তৃত্বের বা রিসিভড অথোরিটির উপর আরেকটি সংশয়বাদী ধারণার সৃষ্টি হয়, আর এটাকে উত্তরাধুনিকতাবাদের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। যদিও উত্তরাধুনিকতাবাদকে একরকম বিষম দর্শন বলা চলে, তবুও এর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরা যায়, যেমন সংশয়বাদের ধারণা, অ্যান্টিফাউন্ডেশনাল বায়াজ (ভিত্তিবিরোধী পক্ষপাতিত্ব), এবং কর্তৃত্বের উপর বিদ্বেষ। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলোই উত্তরাধুনিকতাবাদকে একটি আলাদা দর্শনে পরিণত করেছে।

পোস্টস্ট্রাকচারালিজম একটি বিশাল কালচারাল মুভমেন্ট বা সাংস্কৃতিক আন্দোলন যা জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা নিয়ে বিস্তৃত। এই আন্দোলন শুধুমাত্র স্ট্রাকচারালিজম এবং এর পদ্ধতিকেই বর্জন করে নি, সেই সাথে এই স্ট্রাকচারালিজমের পেছনে থাকা বিভিন্ন ভাবাদর্শগত স্বতসিদ্ধ বা এজাম্পশনকেও বর্জন করে। একজন তাই একে একই সাথে একটি দার্শনিক আন্দোলন এবং একটি রাজনৈতিক আন্দোলনও বলতে পারেন, যা পোস্টমডার্নিজম বা উত্তরাধুনিকতাবাদকেও সাধারণত বলা হয়। পোস্টস্ট্রাকচারালিজম কালচারাল সারটেইনটিজ বা সাংস্কৃতিক নিশ্চয়তাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে যেগুলোকে স্টাকচারালিজম ধারণ করে। এই নিশ্চয়তাগুলোর মধ্যে একটি হল, একটি বিশ্বাস যা অনুসারে এই জগৎ অন্তর্নিহিতভাবেই জ্ঞেয় (intrinsically knowable), আর সেই স্ট্রাকচারালিজম আমাদেরকে এই জগৎকে তৈরি করা বিভিন্ন সিস্টেম বা ব্যবস্থার তালা খুলে দেবার পদ্ধতিগত চাবিটিকে দান করে। স্ট্রাকচারালিজমের সূত্রপাত হয় হয় সুইস ভাষাবিদ ফার্দিনান্দ দে সস্যুরে (Ferdinand de Saussure ) এর লিংগুইস্টিক থিওরি বা ভাষাতত্ত্ব থেকে। এই ভাষাতত্ত্ব আসে সস্যুরের মৃত্যুর পর প্রকাশিত হওয়া বই কোর্স ইন জেনারেল লিংগুইস্টিক্স (১৯১৬) থেকে যা ভাষাবিদ্যার আলোচনায় বিপ্লব এনে দেয়। ভাষা নিয়ে সস্যুরের মূল বক্তব্যটি ছিল, ভাষা সর্বোপরি একটি সিস্টেম বা ব্যবস্থা, এই ব্যবস্থাতে বিভিন্ন নিয়ম নীতি (অথবা এর অন্তর্নিহিত ব্যাকরণ) থাকে যা কিভাবে ভাষাটির বিভিন্ন উপাদান নিয়ন্ত্রিত হবে তা পরিচালিত করে। ভাষা অনেকগুলো “সাইন” দ্বারা তৈরি। আর সাইন দুটো অংশ দিয়ে গঠিত, একটি হল সিগনিফায়ার (শব্দ), আরেকটি হল সিগনিফাইড (ধারণা)। এই দুটো অংশ যুক্ত হয়ে একটি মেন্টাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা মানসিক বোধ তৈরি করে যাতে একটি সাইন গঠিত হয়। যদিও একটি শব্দ এবং সেই শব্দটি যে অবজেক্টকে নামকরণ করছে তাদের মধ্যে কোন সম্পর্ক থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ নয় (সস্যুরে বলেছেন কোন অবজেক্টের পেছনে যেকোন ধরণের শব্দ যুক্ত হয়ে যেতে পারে), তবুও ভাষার নিয়মের একটি শক্তি এটা নিশ্চিত করে যাতে কোন ব্যক্তির খেয়ালেই এই শব্দের সাথে অবজেক্টটির সম্পর্ক পরিবর্তিত না হয়ে যায়। ভাষা এবং এর উৎপাদিত অর্থের মধ্যে একটি স্ট্যাবিলিটি বা স্থিতিশীলতা থাকে। এটা বলে, ভাষাকে অনেকগুলো সাইনের একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে যা ভাষাভিত্তিক সম্প্রদায়ের একটি অংশে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় এমন একটি প্রতিক্রিয়া (predictable response) উৎপন্ন করতে পারে।

সস্যুরের তৈরি ভাষাভিত্তিক মডেলটি স্ট্রাকচারালিস্ট বিশ্লেষণের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। এই ভিত্তি অনুসারে এটা স্বতসিদ্ধ হিসেবে ধরে নেয়া হয় যে, প্রত্যেকটি সিস্টেম বা ব্যবস্থায় একটি অন্তর্নিহিত ব্যাকরণ থাকে যা এর কার্যপ্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। স্ট্রাকচারালিস্ট এনালাইসিস বা স্ট্রাকচারালিস্ট বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই ব্যাকরণকেই উদ্ঘাটিত করা, আর দেখা এটা একটি ট্রাইবাল মিথ, নাকি একটা এডভারটাইজিং ইন্ডাস্ট্রি, নাকি সাহিত্য বা ফ্যাশনের জগৎ। পোস্টস্ট্রাকচারালিস্টগণ স্ট্রাকচারালিস্ট জগতের এরকম পারিপাট্যেরই বিরোধিতা করে, যেখানে নিয়ম থেকে বের হবার কোন সুযোগ নেই, আর সবকিছুই ঠিকঠাক তার জায়গামতই পড়ে যায়। এভাবেই ক্লড লেভাই-স্ট্রাউস অথবা রোলান্ড বার্থেসের মত চিন্তাবিদদের কাছে, কোন ন্যারেটিভ বা বর্ণনার প্রতিটি ডিটেইলস বা খুটিনাটিই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এরা সবাই মিলেই ফাইনাল প্রোডাক্ট বা চূড়ান্ত উৎপাদটিকে তৈরি করে (এখানে কোন এলোমেলো উপাদান নেই), আর এই ন্যারেটিভগুলো নির্দিষ্ট রীতি বা জানরার মধ্যে পড়ে যায়, যেখানে কোন বিশেষ ঘটনা (ধরুণ একটি ট্রাইবাল মিথ বা গোষ্ঠীভিত্তিক পুরাণ) কেবলই একটি কেন্দ্রীয় ধারণার একটি ভেরিয়েশন বা বৈচিত্র্য মাত্র। এরকম একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি সিস্টেমকে অনেকটাই অন্য সিস্টেমগুলোর মত মনে হয়, আর এর ব্যাকরণের বিশ্লেষণও একটি পরিষ্কার প্রেডিক্টেবল কার্যে পরিণত হয়, ঠিক যেন এমনটা যে একজন আগে থেকেই জেনে যান যে তিনি কি খুঁজে পেতে যাচ্ছেন। এখন যে কেউ এর বিরুদ্ধে বলতেই পারেন (যা পোস্টস্ট্রাকচারালিস্টগণ করেন), স্ট্রাকচারালিস্ট যে এনালাইটিকাল টেকনিক বা বিশ্লেষণী পদ্ধতিটিকে ব্যবহার করছেন তা আগে থেকেই ফলাফলগুলোকে নিশ্চিত করে ফেলে। যেখানে স্ট্রাকচারালিজমকে বিভিন্ন চান্স, সৃজনশীলতা অথবা অপ্রত্যাশিত বিষয়গুলোকে সুযোগ দিতে একরকম দেখাই যায় না, সেখানে একজন পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ট এই চান্স, সৃজনশীলতা ও অপ্রত্যাশিত বিষয়গুলোকেই সিস্টেমের সকল মিল বা ঐকতানের থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে। একজন পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ট থিংকারের বিশ্লেষণে অমিল, ভিন্নতা এবং আনপ্রেডিক্টেবিলিটিকে খুঁজে বের করার অঙ্গীকারকেই লক্ষ্য করা যায়।
(চলবে)

মন্তব্যসমূহ